Loading stocks...

আনুগত্যের বাজারে মেধার মূল্য কত?

একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি তার ভবন, অবকাঠামো কিংবা বাহ্যিক চাকচিক্যে নয়; বরং সেই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মানুষের মেধা, যোগ্যতা, সততা, দক্ষতা ও কর্মনিষ্ঠার ওপর নির্ভর করে। একটি প্রতিষ্ঠান তখনই টেকসইভাবে এগিয়ে যায়, যখন সেখানে যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন হয় এবং কর্মীরা নিজেদের দক্ষতা ও বিবেক দিয়ে কাজ করার স্বাধীনতা পান। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানে যখন যোগ্যতার চেয়ে ব্যক্তিবিশেষের প্রতি আনুগত্য বেশি মূল্য পেতে শুরু করে, তখন সেখান থেকেই শুরু হয় অবক্ষয়ের পথ।যোগ্য মানুষ সাধারণত নিজের কাজ দিয়ে পরিচিত হতে চান। তারা ভুল দেখলে তা তুলে ধরেন, প্রয়োজন হলে প্রশ্ন করেন, নতুন ধারণা দেন এবং প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে ভিন্নমত প্রকাশ করতেও দ্বিধা করেন না। কারণ তাদের কাছে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানই মুখ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কিছু প্রতিষ্ঠানে এই ভিন্নমত ও যুক্তিবোধই একসময় ‘অবাধ্যতা’ হিসেবে বিবেচিত হয়। সেখানে নেতৃত্বের সঙ্গে একমত হওয়াই হয়ে ওঠে যোগ্যতার অন্যতম অনানুষ্ঠানিক মাপকাঠি।অন্যদিকে সুবিধাবাদীরা খুব দ্রুত বুঝে ফেলেন কাজের চেয়ে কার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো, তোষামোদ কতটা করা যায় এবং কোন অবস্থানে কী কথা বলতে হবে। ফলে কর্মদক্ষতা, সততা ও সৃজনশীলতার পরিবর্তে ব্যক্তিগত আনুগত্য যখন মূল্যায়নের মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রতিষ্ঠানে একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতির জন্ম হয়। সেখানে প্রশ্ন হয়ে ওঠে ‘কে সবচেয়ে যোগ্য?’ নয়; বরং ‘কে কার ঘনিষ্ঠ?’এর সরাসরি প্রভাব পড়ে প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিবেশে। যোগ্য ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কর্মীরা যখন বারবার উপেক্ষিত হন, তখন তাদের কর্মস্পৃহা কমতে থাকে। কেউ নীরবে নিজেকে গুটিয়ে নেন, কেউ কেবল দায়িত্বটুকু পালন করেন, আবার কেউ সুযোগ পেলে প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যাওয়ার কথাও ভাবেন। বিপরীতে, যারা তোষামোদ ও আনুগত্যের মাধ্যমে সুবিধা পেতে অভ্যস্ত, তারা ক্রমে আরও উৎসাহিত হন। এতে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে একটি ভুল বার্তা ছড়িয়ে পড়ে যোগ্য হওয়ার চেয়ে অনুগত হওয়াই বেশি লাভজনক।এই সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। কারণ এতে মেধার অপচয় হয়, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয় এবং নেতৃত্বের কাছে বাস্তব পরিস্থিতির নির্ভুল চিত্র পৌঁছায় না। যখন সবাই শুধু প্রশংসা করতে শেখে, তখন ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলার মানুষ কমে যায়। ফলে ছোট ভুল সময়ের সঙ্গে বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।আরেকটি বড় ক্ষতি হলো প্রতিষ্ঠানে ন্যায্যতার বোধ দুর্বল হয়ে পড়ে। একজন কর্মী যখন দেখেন, তাঁর চেয়ে কম দক্ষ কেউ শুধু আনুগত্যের কারণে বেশি সুযোগ পাচ্ছেন, তখন তাঁর মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। একই সঙ্গে অন্যরাও বুঝতে শুরু করেন যে কর্মদক্ষতার চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্কই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তখন মেধাবীরা প্রতিযোগিতা থেকে সরে যান, আর সুবিধাবাদীরা সামনে চলে আসেন।একটি সুস্থ প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের প্রতি আস্থা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আস্থা কখনো অন্ধ আনুগত্যের নাম হতে পারে না। একজন দক্ষ কর্মী প্রয়োজনে নেতৃত্বের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করবেন, আবার প্রয়োজন হলে যুক্তি দিয়ে ভিন্নমতও জানাবেন। কারণ ভিন্নমত মানেই বিরোধিতা নয়; অনেক সময় ভিন্নমতই ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধনের সবচেয়ে কার্যকর সুযোগ তৈরি করে।প্রতিষ্ঠানপ্রধানের প্রকৃত সাফল্য কতজন অনুগত মানুষ তৈরি করেছেন, তার ওপর নির্ভর করে না; বরং কতজন যোগ্য, দক্ষ ও সৎ মানুষকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন, তার ওপর নির্ভর করে। একজন দূরদর্শী নেতা নিজের চারপাশে শুধু প্রশংসাকারী মানুষ চান না; তিনি এমন মানুষ চান, যারা প্রয়োজনে সত্য কথা বলবেন, ভুল ধরিয়ে দেবেন এবং প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে যুক্তিসংগত পরামর্শ দেবেন।মনে রাখতে হবে, আনুগত্য দিয়ে হয়তো কিছু সময়ের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে পারে না। প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন যোগ্যতা, সততা, জবাবদিহি, দক্ষতা ও ন্যায়ভিত্তিক মূল্যায়ন।তাই যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য সময়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত কে কতটা অনুগত তা নয়; কে কতটা যোগ্য, সৎ, দক্ষ এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য কতটা কার্যকর সেটিই।কারণ মেধাকে অবমূল্যায়ন করে কোনো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন সমৃদ্ধ হতে পারে না। যোগ্য মানুষকে মূল্যায়ন করলে তারা প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেন; আর সুবিধাবাদিতাকে পুরস্কৃত করলে একসময় পুরো প্রতিষ্ঠানই সুবিধাবাদিতার সংস্কৃতিতে বন্দী হয়ে পড়ে।আনুগত্য মানুষকে পাশে রাখতে পারে, কিন্তু যোগ্যতাই একটি প্রতিষ্ঠানকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়।

আনুগত্যের বাজারে মেধার মূল্য কত?
🔒