Loading stocks...

ছোটগল্পঃ শেষ ফুল নিশাত রহমান নিশি


প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ডাউনলোড কার্ড

ছোটগল্পঃ শেষ ফুল   নিশাত রহমান নিশি



জুলাই চলমান।

বেলা ৫টা। কিছুক্ষণ পরই চারদিকে অন্ধকার হয়ে আসবে। অবশ্য আয়োজন করে অন্ধকার ঘনিয়ে আসার দরকার নেই। কয়েক দিন যাবৎ ১২-গেজ শটগান, গ্রেনেড লঞ্চার, টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেডের বিকট শব্দে চারদিক কুটকুটে কালো হয়ে আছে। এর মধ্যে উড়ে যাচ্ছে সাদা-কালো ধোঁয়া। ধোঁয়াগুলো যেন কতগুলো মায়ের সন্তান হারানোর ক্ষোভ আর আর্তনাদের প্রতিচ্ছবি। 

কিছুক্ষণের মধ্যেই সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তার সঙ্গে নিস্তব্ধ হয়ে যায় গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় গলাকাটা মুরগির মতো ছটফট করতে থাকা তাজা প্রাণগুলো। সারাদিন কেবল রাস্তা থেকে ক্রমাগত হিংস্র গুলির শব্দ বেজে ওঠে এবং আহাজারির কান্না। যেন চারদিকে শকুনের চলাফেরা। যে তার শিকারের সামনে আসবে, তাকেই খুবলে খুবলে খাবে। অথচ শকুনদের ভয় না পেয়ে সামনে গিয়ে দুই হাত মিলিয়ে দিচ্ছে যুবকরা। 

কোথা থেকে এই তরুণ যুবকদের এত সাহস জেগে উঠল, তা শকুনগুলো ভেবে কুল পাচ্ছে না।

আজ শুক্রবার—

এ বাড়ির ছোট মেয়ের নাম রিয়া। মিস্টার গোপের একমাত্র সন্তান। মিস্টার গোপ পুলিশের বড় কর্মকর্তা। বিয়ের দীর্ঘ ১৬ বছর পর তার কন্যা তার ঘরে আলো করে আসে। তার বুক শীতল হয়। রিয়ার বয়স ৫-৬ বছর হবে। প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মিস্টার গোপ তাকে বেশ কয়েক দিন স্কুলে যেতে দেন না। গেটের বাইরে যাওয়া তার জন্য সম্পূর্ণ নিষেধ। এমনকি রিয়ার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা, ছাদেও যেতে দেয় না। বাবা ছাদে তালা দিয়ে রেখে, চাবি নিয়ে বাইরে যান। রাতে ফিরে আসেন। 

আজ বাবা বাড়িতে আছেন। রিয়া বাবার কোলে বসে আদুরে স্বরে বলে,

— বাবা, একটু ছাদের চাবিটা দেবে? আমি শুধু গোলাপগাছে পানি দিয়েই চলে আসব। আর দেখব, লাল গোলাপটা ফুটেছে কি না। পুরো ছাদজুড়ে শুধু সাদা আর হলুদ রঙের গোলাপ। লাল গোলাপটা যেদিন ফুটবে, আমি তোমাকে দেব। কারণ আমি তোমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। আমি কার্টুনে দেখেছি, লাল গোলাপ হলো ভালোবাসার প্রতীক। নবিতা ডোরেমনকে লাল গোলাপ দিয়েছে। ডোরেমন অনেক খুশি হয়েছে। তুমিও অনেক খুশি হবে। লাল গোলাপটা ফুটেছে কি না দেখেই চলে আসব। ছাদের চাবিটা দাও না, বাবা?

মিস্টার গোপ আজ মেয়ের কথা ফেলতে পারলেন না। চাবিটা দিলেন। বললেন—

— যাও মা, গিয়ে দেখো লাল গোলাপটা ফুটেছে কি না। আমি ওয়াটারিং ক্যান নিয়ে আসছি। দুজন মিলে ফুলগাছে পানি দেব। ফুলগুলো হয়তো শুকিয়ে যাচ্ছে। তুমি যাও, আমি এখনই আসছি।

রিয়া খুশিতে চাবি নিয়ে ছাদে দৌড় দিল। মিস্টার গোপ ওয়াটারিং ক্যান আনতে বারান্দায় গেলেন।

রিয়া ছাদের তালা খুলে তার প্রিয় ফুলগুলো দেখে খুশিতে লাফিয়ে উঠল। আজ কত দিন পর সে ফুলগাছগুলো দেখছে। কত দিন পর ফুলগুলোকে সে হাত দিয়ে ছুঁল! তবে লাল গোলাপ ফুটেছে কি না, এখনো খুঁজে পাচ্ছে না। মাইকে একটা গান বাজছে,

কত বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা,

বন্দীশালার ওই শিকলভাঙা।

তাঁরা কি ফিরিবে আজ সুপ্রভাতে,

যত তরুণ অরুণ গেছে অস্তাচলে।

এমন কঠিন গান রিয়া কখনো শোনেনি। তবুও তার ভীষণ ভালো লাগছে। গান শুনতে শুনতে সে হাজারো সাদা-হলুদ গোলাপের মধ্যে বাবার জন্য লাল গোলাপটা খুঁজছে।

হঠাৎই রিয়া আকাশ চিরে আগুনের মতো লম্বা কিছু একটা ধেয়ে আসতে দেখল। বিকট শব্দ। ওয়াটারিং ক্যান ফেলে মিস্টার গোপসহ বাড়ির সকলে ছাদের দিকে দৌড় দিল। মিস্টার গোপ ছাদে এসে দেখলেন, পুরো ছাদজুড়ে সাদা ও হলুদ গোলাপ। তার মধ্যে একটা টকটকে লাল গোলাপ ফুটে আছে। লাল গোলাপটি যেন সব ফুলের সৌন্দর্য কেড়ে নিয়েছে। পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য কেড়ে নিয়ে লাল গোলাপটা যেন জ্বলজ্বল করছে।

হঠাৎ একটা মিষ্টি কণ্ঠস্বর তার কানে বেজে উঠল। যেন লাল গোলাপটি তাকে ফিসফিসিয়ে বলছে—

“আমি ফুল, আমায় ছিঁড়ো না, আমায় ছিঁড়ো না।”

বাক্যটি বারবার আকাশে প্রতিধ্বনিত হয়ে মিস্টার গোপের কানে বেজে বেজে উঠছে। মিস্টার গোপের কান ফেটে যাচ্ছে। তিনি চিৎকার করে উঠলেন।

এই সংবাদটি আপনার কেমন লেগেছে?


খবরটি রেটিং দিন

গড় রেটিং: ০/৫ (০ ভোট)

ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

ধনবাড়ীতে NID নিয়ে বয়স্ক ভাতার কারসাজির অভিযোগ/  ভাতাভোগীর অজান্তে নিবন্ধন, অন্য মোবাইল হিসাবে টাকা উত্তোলনের দাবি |

ধনবাড়ীতে NID নিয়ে বয়স্ক ভাতার কারসাজির অভিযোগ/ ভাতাভোগীর অজান্তে নিবন্ধন, অন্য মোবাইল হিসাবে টাকা উত্তোলনের দাবি |

ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত অসহায় নাদুর পাশে ‘উদারতা ফাউন্ডেশন’: তুলে দেওয়া হলো নগদ আর্থিক সহায়তা

ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত অসহায় নাদুর পাশে ‘উদারতা ফাউন্ডেশন’: তুলে দেওয়া হলো নগদ আর্থিক সহায়তা

৫ আগস্ট উপলক্ষে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে ময়নুল ইসলাম প্রামাণিকের বিশেষ বার্তা

৫ আগস্ট উপলক্ষে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে ময়নুল ইসলাম প্রামাণিকের বিশেষ বার্তা

বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখতে বাইরে যাওয়া স্বামীর বাড়িতে ঢুকে নারীকে ধর্ষণ

বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখতে বাইরে যাওয়া স্বামীর বাড়িতে ঢুকে নারীকে ধর্ষণ

নেত্রকোনায় বৌ-ভাত অনুষ্ঠানে বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়

নেত্রকোনায় বৌ-ভাত অনুষ্ঠানে বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়

ইবনে সিনা ন্যাচারাল মেডিসিনের উদ্যোগে খুলনায়  এনজিকিউ এবং কায়রোক্যাপ প্রোডাক্টের সায়েন্টিফিক সেমিনার অনুষ্ঠিত।  ‎

ইবনে সিনা ন্যাচারাল মেডিসিনের উদ্যোগে খুলনায় এনজিকিউ এবং কায়রোক্যাপ প্রোডাক্টের সায়েন্টিফিক সেমিনার অনুষ্ঠিত। ‎

পোরশা উপজেলার পারিলা গ্রামের সন্তান রাশেদুজ্জামান খান কলেজ জীবন থেকে ছাত্ররাজনীতিতে পথচলা।

পোরশা উপজেলার পারিলা গ্রামের সন্তান রাশেদুজ্জামান খান কলেজ জীবন থেকে ছাত্ররাজনীতিতে পথচলা।

৫ নং ঘাটনগর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মাওলানা হোসাইন আহমদ

৫ নং ঘাটনগর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মাওলানা হোসাইন আহমদ

মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা দাবী করেন উপ পরিদর্শক মেহেদী

মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা দাবী করেন উপ পরিদর্শক মেহেদী

সরকারী পে-স্কেল বিবেচনায় বিক্রয় প্রতিনিধিদের বেতন কাঠামো নির্ধারণের দাবি

সরকারী পে-স্কেল বিবেচনায় বিক্রয় প্রতিনিধিদের বেতন কাঠামো নির্ধারণের দাবি

দৈনিক জিরো টেন

শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬


ছোটগল্পঃ শেষ ফুল নিশাত রহমান নিশি

প্রকাশের তারিখ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image



জুলাই চলমান।

বেলা ৫টা। কিছুক্ষণ পরই চারদিকে অন্ধকার হয়ে আসবে। অবশ্য আয়োজন করে অন্ধকার ঘনিয়ে আসার দরকার নেই। কয়েক দিন যাবৎ ১২-গেজ শটগান, গ্রেনেড লঞ্চার, টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেডের বিকট শব্দে চারদিক কুটকুটে কালো হয়ে আছে। এর মধ্যে উড়ে যাচ্ছে সাদা-কালো ধোঁয়া। ধোঁয়াগুলো যেন কতগুলো মায়ের সন্তান হারানোর ক্ষোভ আর আর্তনাদের প্রতিচ্ছবি। 

কিছুক্ষণের মধ্যেই সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তার সঙ্গে নিস্তব্ধ হয়ে যায় গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় গলাকাটা মুরগির মতো ছটফট করতে থাকা তাজা প্রাণগুলো। সারাদিন কেবল রাস্তা থেকে ক্রমাগত হিংস্র গুলির শব্দ বেজে ওঠে এবং আহাজারির কান্না। যেন চারদিকে শকুনের চলাফেরা। যে তার শিকারের সামনে আসবে, তাকেই খুবলে খুবলে খাবে। অথচ শকুনদের ভয় না পেয়ে সামনে গিয়ে দুই হাত মিলিয়ে দিচ্ছে যুবকরা। 

কোথা থেকে এই তরুণ যুবকদের এত সাহস জেগে উঠল, তা শকুনগুলো ভেবে কুল পাচ্ছে না।

আজ শুক্রবার—

এ বাড়ির ছোট মেয়ের নাম রিয়া। মিস্টার গোপের একমাত্র সন্তান। মিস্টার গোপ পুলিশের বড় কর্মকর্তা। বিয়ের দীর্ঘ ১৬ বছর পর তার কন্যা তার ঘরে আলো করে আসে। তার বুক শীতল হয়। রিয়ার বয়স ৫-৬ বছর হবে। প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মিস্টার গোপ তাকে বেশ কয়েক দিন স্কুলে যেতে দেন না। গেটের বাইরে যাওয়া তার জন্য সম্পূর্ণ নিষেধ। এমনকি রিয়ার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা, ছাদেও যেতে দেয় না। বাবা ছাদে তালা দিয়ে রেখে, চাবি নিয়ে বাইরে যান। রাতে ফিরে আসেন। 

আজ বাবা বাড়িতে আছেন। রিয়া বাবার কোলে বসে আদুরে স্বরে বলে,

— বাবা, একটু ছাদের চাবিটা দেবে? আমি শুধু গোলাপগাছে পানি দিয়েই চলে আসব। আর দেখব, লাল গোলাপটা ফুটেছে কি না। পুরো ছাদজুড়ে শুধু সাদা আর হলুদ রঙের গোলাপ। লাল গোলাপটা যেদিন ফুটবে, আমি তোমাকে দেব। কারণ আমি তোমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। আমি কার্টুনে দেখেছি, লাল গোলাপ হলো ভালোবাসার প্রতীক। নবিতা ডোরেমনকে লাল গোলাপ দিয়েছে। ডোরেমন অনেক খুশি হয়েছে। তুমিও অনেক খুশি হবে। লাল গোলাপটা ফুটেছে কি না দেখেই চলে আসব। ছাদের চাবিটা দাও না, বাবা?

মিস্টার গোপ আজ মেয়ের কথা ফেলতে পারলেন না। চাবিটা দিলেন। বললেন—

— যাও মা, গিয়ে দেখো লাল গোলাপটা ফুটেছে কি না। আমি ওয়াটারিং ক্যান নিয়ে আসছি। দুজন মিলে ফুলগাছে পানি দেব। ফুলগুলো হয়তো শুকিয়ে যাচ্ছে। তুমি যাও, আমি এখনই আসছি।

রিয়া খুশিতে চাবি নিয়ে ছাদে দৌড় দিল। মিস্টার গোপ ওয়াটারিং ক্যান আনতে বারান্দায় গেলেন।

রিয়া ছাদের তালা খুলে তার প্রিয় ফুলগুলো দেখে খুশিতে লাফিয়ে উঠল। আজ কত দিন পর সে ফুলগাছগুলো দেখছে। কত দিন পর ফুলগুলোকে সে হাত দিয়ে ছুঁল! তবে লাল গোলাপ ফুটেছে কি না, এখনো খুঁজে পাচ্ছে না। মাইকে একটা গান বাজছে,

কত বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা,

বন্দীশালার ওই শিকলভাঙা।

তাঁরা কি ফিরিবে আজ সুপ্রভাতে,

যত তরুণ অরুণ গেছে অস্তাচলে।

এমন কঠিন গান রিয়া কখনো শোনেনি। তবুও তার ভীষণ ভালো লাগছে। গান শুনতে শুনতে সে হাজারো সাদা-হলুদ গোলাপের মধ্যে বাবার জন্য লাল গোলাপটা খুঁজছে।

হঠাৎই রিয়া আকাশ চিরে আগুনের মতো লম্বা কিছু একটা ধেয়ে আসতে দেখল। বিকট শব্দ। ওয়াটারিং ক্যান ফেলে মিস্টার গোপসহ বাড়ির সকলে ছাদের দিকে দৌড় দিল। মিস্টার গোপ ছাদে এসে দেখলেন, পুরো ছাদজুড়ে সাদা ও হলুদ গোলাপ। তার মধ্যে একটা টকটকে লাল গোলাপ ফুটে আছে। লাল গোলাপটি যেন সব ফুলের সৌন্দর্য কেড়ে নিয়েছে। পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য কেড়ে নিয়ে লাল গোলাপটা যেন জ্বলজ্বল করছে।

হঠাৎ একটা মিষ্টি কণ্ঠস্বর তার কানে বেজে উঠল। যেন লাল গোলাপটি তাকে ফিসফিসিয়ে বলছে—

“আমি ফুল, আমায় ছিঁড়ো না, আমায় ছিঁড়ো না।”

বাক্যটি বারবার আকাশে প্রতিধ্বনিত হয়ে মিস্টার গোপের কানে বেজে বেজে উঠছে। মিস্টার গোপের কান ফেটে যাচ্ছে। তিনি চিৎকার করে উঠলেন।


দৈনিক জিরো টেন

মোসা: হাফসা আক্তার
প্রকাশক ও সম্পাদক
নির্বাহী সম্পাদক
এডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসেন
অ্যাডভোকেট মোঃ জসীম উদ্দীন
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
লিগ্যাল এডভাইজার ও
নীতিমালা উপদেষ্টা

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
ছোটগল্পঃ শেষ ফুল নিশাত রহমান নিশি
0:00 / 0:00
1x
🔒